ইন্টারনেট নাকি আন্তর্জাল?

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

রবীন্দ্রনাথ বলতেন “বাংলায় পরিভাষার স্থির নাই, অতএব পরিভাষার প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা কর্তব্য, কিন্তু বিবাদ করা অসঙ্গত”। রবীন্দ্রনাথ বিবাদের কথা কেনো এনেছেন সেটি সহজেই অনুমেয়: তিনি যখন Institution এর বাংলা করলেন “প্রতিষ্ঠান” এবং “Compulsory” এর বাংলা করলেন “আবশ্যিক” তখন উনাকে কম বিরোধীতার সম্মূখীন হতে হয় নি। বিভিন্ন বিদেশি ভাষার শব্দের যথার্থ প্রতিশব্দ ঠিক করতে আমাদের মজ্জাগত হীনমন্যতাবোধ সবসময় বাঁধা দেয়। এর দৌরাত্ম্যেই অনেক সময় প্রতিশব্দ ঠিক করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটা বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা পরিভাষা নিয়ে আলোচনা না করে বিবাদ শুরু করে দিই। আর আলোচনা করলেও সে আলোচনার ধারাটা সবসময় ভুল পথ ধরেই এগিয়ে গিয়ে কিছু পরে পথ খুঁজে না-পাওয়ার হতাশাকে সঙ্গী করে ফলাফলশূন্যতায় বিলীন হয়ে যায়। উদাহরণ ভাবা যাক: যেমন ‘সহানুভূতি’। এটা sympathy শব্দের তর্জমা। ‘সিম্প্যাথি’-র গোড়াকার অর্থ ছিল ‘দরদ’। ওটা ভাবের আমলের কথা, বুদ্ধির আমলের নয়। কিন্তু ব্যবহারকালে ইংরেজিতে ‘সিম্প্যাথি’-র মূল অর্থ আপন ধাতুগত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই কোনো একটা প্রস্তাব সম্বন্ধেও সিম্প্যাথি-র কথা শোনা যায়। বাংলাতেও আমরা বলতে আরম্ভ করেছি ‘এই প্রস্তাবে আমার সহানুভূতি আছে’। বলা উচিত ‘সম্মতি আছে’ বা ‘আমি এর সমর্থন করি’। যা-ই হোক্—সহানুভূতি কথাটা যে বানানো কথা এবং ওটা এখনো মানান-সই হয় নি তা বেশ বোঝা যায় যখন ও শব্দটাকে বিশেষণ করবার চেষ্টা করি। ‘সিম্প্যাথেটিক্’-এর কী তর্জমা হতে পারে, ‘সহানুভৌতিক, বা ‘সহানুভূতিশীল’ বা ‘সহানুভূতিমান’ ভাষায় যেন খাপ খায় না-সেইজন্যেই আজ পর্যন্ত বাঙালি লেখক এর প্রয়োজনটাকেই এড়িয়ে গেছে। দরদের বেলায় ‘দরদী’ ব্যবহার করি, কিন্তু সহানুভূতির বেলায় লজ্জায় চুপ ক’রে যাই। অথচ সংস্কৃত ভাষায় এমন একটি শব্দ আছে, যেটা একেবারেই তথার্থক। সে হচ্ছে ‘অনুকম্পা’। ধ্বনিবিজ্ঞানে ধ্বনি ও বাদ্যযন্ত্রের তারের মধ্যে সিম্প্যাথি-র কথা শোনা যায়—যে সুরে বিশেষ কোনো তার বাঁধা, সেই সুর শব্দিত হলে সেই তারটি অনুধ্বনিত হয়। এই তো ‘অনুকম্পন’। অন্যের বেদনায় যখন আমার চিত্ত ব্যথিত হয়, তখন সেই তো ঠিক ‘অনুকম্পা’। ‘অনুকম্পায়ী’ কথাটা সংস্কৃতে আছে। ‘অনুকম্পাপ্রবণ’ শব্দটাও মন্দ শোনায় না। ‘অনুকম্পালু’ বোধ করি ভালোই চলে। তাহলে কোনটা বেশি উপযোগী: অনুকম্পা নাকি সহানুভূতি?
উপরে আলোচনাটি পারিভাষিক সংক্রান্ত আলোচনাগুলো কেমন হওয়া উচিত তার একটি উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু আমাদের আলোচনাগুলো চলে ভিন্নধারায়। চেয়ার টেবিলের মতো শত শত বছরের অভ্যাসে যে শব্দগুলো বাংলা ভাষায় এসে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে সেগুলো দোহাই দিয়ে আমরা অনেক সময় অন্য অনেক ইংরেজি শব্দকে ইংরেজি গড়নে রেখে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখায়। যেখানে আমাদের আলোচনা হওয়া উচিত কোন বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করা যাবে সেখানে আমরা আলোচনা কর ইংরেজি নাকি বাংলা শব্দ ব্যবহার করবো। আসলে সবকিছু অভ্যাস এবং মানসিকতার ব্যপার। মূঠোফোন, কথাবন্ধু/বেতার সারথী, রক্তচাপ, নীড়পাতা শব্দগুলো শ্রুতিমধুর ঠেকে, অথচ এগুলোরও কম বিরোধিতা হয় নি। তেমনি এখন হয়তো আন্তর্জাল-এ একটু খটকা লাগছে, হয়তো মনে হচ্ছে অসঙ্গত। কিন্তু ভাষার একটি সুবিধা হলো বার বার ব্যবহারের দ্বারাই শব্দবিশেষের অর্থ আপনি পাকা হয়ে উঠে, মূলে যেটা অসংগত, অভ্যাসে সেটা সংগতি লাভ করে। আমাদের কর্তব্য হলো নতুন প্রতিশব্দকে বরণ করে নেওয়ার মতো মানসিকতাকে ধারণ করা। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বলেছিলেন দখলের দলিলটাই ভাষায় স্বত্ত্বের দলিল হয়ে উঠে সে কারণেই যেখানে ব্যাকরণ আমাদের বলছে “আব্শ্যকতা” লিখতে সেখানে আমরা ‘আবশ্যক’ ব্যবহার করি। ‘অনূবাদিত’ তার বংশপরিচয় ভূলে দিব্যি হয়ে যাচ্ছে ‘অনূদিত’। তাই অনেকসময় আমরা কী লিখছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমি মনে করি আমরা যদি “আন্তর্জাল” ব্যবহার শুরু করি তবে সেটা নিমেষেই “ইন্টারনেট”-কে প্রতিস্থাপিত করতে পারবে।

অবশ্য অনেকের সাথে আমার এটি নিয়ে তর্ক বিতর্ক করার সুযোগ হয়েছে এবং তর্ক করতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখীও হতে হয়েছে। এখানে পাঠকদের অবগতির জন্য একটি কথা জানাতে চাই যাদের সাথেই ভাষার এ সকল ক্রুটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আমার আলোচনা হয়েছে সকল ক্ষেত্রেই  আলোচনার শুরুটা কিন্তু উনারাই করেছেন; আমি শুধুমাত্র আমার মতামত জানিয়েছি। কিন্তু  আলোচনার গভীরে গিয়েছি তখনই শুনতে হয়েছে ‘অর্থহীন অ-কাজ(!)’-এ আমি সময় নষ্ট করছি। উনারা আলোচনা করলে সেটি অকাজ(!) হয় না, আমি বেচারা একটু নিজের মতামত দিতে গেলেই কেনো সেটি অকাজ(!) হয়ে যায় সেটি আমার কাছে ঠিক বোধগম্য নয়। এর ব্যাখ্যা তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করেও পাই নি। ব্যখ্যা না পেলেও ‘ছাগল, শিয়াল’ এ ধরনের কিছু অপ্রীতিকর বিশেষণ চা-চাইতে পেয়েছি উনাদের কল্যানে।

কোন বিতর্কেই যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে যুক্তিদাতাকে [কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও] ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করা (এটাকে যুক্তিবিজ্ঞানের ভাষায় Ad Hominem বলা হয়) সুস্থ মন-মানসিকতার পরিচয় নয়। তাই আসুন ব্যক্তিগতভাবে উনাদের আক্রমন না করে চেষ্টা করি উনাদের যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করতে।

 ৩

অনেকের  মতে ‘আন্তর্জাল’ পরিভাষায় মূলগত কিছু সমস্যা আছে। তবে আমার কাছে সমস্যটা ঠিক কী সেটা বোধগম্য নয় এবং তাঁদের কাছে জানতে চেয়েও এর কোনো সুদুত্তর পাই নি।

বাংলা ভাষার পরিভাষাগুলোকে খেয়াল করলে এগুলোর গঠিত হওয়ার দু’টি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়:

প্রথম নীতি হচ্ছে অনুবাদ-নীতি। অনেক সময় আভিধানিক অনুবাদ করে পারিভাষিক শব্দ তৈরি করা হয়। আবার অনেক সময় যে বস্তুর যে-কাজ বা যে-ব্যবহার সেটাকেই শব্দে অনুবাদ করে পারিভাষিক শব্দ তৈরি করা হয়।

উদাহরণ:

Aeroplane >উড়োজাহাজ,

Globalization – বিশ্বায়ন

Radio Jokey – বেতার সারথী

দ্বিতীয় নীতি হচ্ছে, স্বীকরণ-নীতি। কোন বিদেশী শব্দকে আত্মীকরণের ক্ষমতা এদের অসাধরণ। বিদেশী শব্দে ব্যবহৃত বিদেশী ধ্বনিকে নিজের ভাষার ধ্বনিতে পরিণত ক’রে এরা বিদেশী শব্দকে দেশী শব্দে পরিণত করে অদ্ভুতরূপে, যেমন-

Bomb – বোমা,

Voting-ভোটাভুটি,
Pinnace-পান্সি(নাও)

আমরা দেখতে পাই internet থেকে অনুবাদ-নীতি অনুসরণ করেই আন্তর্জাল হয়েছে। inter এর অর্থ অনেকেই “অন্তর” বলে দাবি করেন। তাঁদের মতে inter এর অন্তর এবং net এর “জাল” থেকে এসেছে ইণ্টারনেট। অন্তর থেকে “অন্তর+জাল” এরূপে হয়েছে অন্তর্জাল যেটি Intranet-এর বাংলা প্রতিশব্দ। এটা নিয়ে অনেকেই আবার বলেন এটি হয়েছে “আন্তঃ+জাল” এ দু’টি শব্দের সমন্বয়ে। তবে আমার মতে এটি না হওয়ার সম্ভবনায় বেশি কারণ অন্তঃ এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। যদিও স্বতন্ত্র পদ রূপে এর উচ্চারণ ‘অন্তহ্’ হয়; সমাসবদ্ধ পদে বিসর্গ(ঃ)-এর পরবর্তী ধ্বনির দ্বিত উচ্চারণ হয়ে থাকে, বিসর্গের কোনো উচ্চারণ থাকে না। যেমন অন্তঃকরণ=অন্তোক্করণ। সেভাবে এর রূপ হতো তখন “আন্তঃজাল” এবং উচ্চারণ হতো “আন্তোজ্জাল”। সেরকম যেহেতু না তাহলে আমরা ধরে নিতেই পারি এটি অন্তর থেকে এসেছে।

কিন্তু “আন্তর্জাল”-এর শব্দটি  ‘অন্তর’ হতে না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। অনেকেই অবশ্য প্রমাণ হিসাবে অন্তর্+জাতি+ষ্ণিক(ইক) শব্দটিকে নিয়ে আসবেন।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি রাখে। আরে সেটি হচ্ছে: অন্তর্+জাতি+ষ্ণিক(ইক) -এ অন্তর কেনো আন্তর হয়ে গেলো। কোত্থুকে এলো এ আকার? এর ব্যকরণগত ব্যখ্যা আছে। শেষ ইক্‌ প্রত্যয় যুক্ত হওয়ায় অগ্রবর্তী বর্ণে আকার যুক্ত হয়েছে। ফলে ‘অ’ হয়ে গেছে ‘আ’। একইভাবে ‘পরিভাষা’এর সাথে যখন ইক্‌ প্রত্যয় যুক্ত হচ্ছে তখনো অগ্রবর্তী বর্ণ (প)-এর সাথে আকার যুক্ত হয়ে হয়ে যাচ্ছ পারিভাষিক। তাহলে দেখা যাচ্ছে এখানে আকারটা উড়ে এসে জুড়ে বসে অনাধিকারচর্চা করে নি, এর ব্যকরণগত ভিত্তি আছে। কিন্ত যদি আমরা ধরেই নিই যে আন্তর্জাল গঠিত হয়েছে ‘অন্তর+জাল’-এভাবে তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় কেনো ‘অ’ টা এমনি এমনি ‘আ’ হয়ে যাচ্ছে? কী এর ব্যাখ্যা। কেনো এ অন্যায় আকার?

তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি শব্দটি আসলে ঘটিত হয়েছে “আন্তর+জাল”-এ দু’টি শব্দের সমন্বয়ে। আন্তর-এর মানে হচ্ছে ‘অন্তর্গত’। net-এর মানে ‘জাল”। জালের মতো বিস্তৃতির কারণেই যে network শব্দে net এসেছে এটি নিয়ে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। সেভাবে চিন্তা করলে internet-এ বাংলা ‘জাল’ দারুণভাবে মূল ভাবার্থকে ফুটিয়ে তুলে।

আন্তর্জাল: আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে জালের মতো বিস্তৃত যে নেটওয়ার্ক এবং তাদের অন্তর্গত যে সম্পর্ক সেটাই তো আন্তর্জাল।

আবার কেউ তর্কে ফেনা তুলে দাবি করেন “আন্তর্জাল” প্রতিশব্দটি ঠিক যুৎসই হয় নি। কিছুটা অসম্পূর্ণতা, কিছুটা অসঙ্গতি রয়েই গেছে। তাই তাঁরা কিছুটা জোর দিয়ে বলেন, “ইন্টারনেট ‘আন্তর্জাল’ নয়, যতদিন পর্যন্ত সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ পরিভাষা খুঁজে না পাবেন ততোদিন ইন্টারনেটই ব্যবহার করবেন”।

তখন বিনয়ের সাথে এসকল তার্কিকদের কাছে জানতে চাই কী অসম্পূর্ণতা, কী অসঙ্গতি? কিন্তু পরিতাপের বিষয়ে হচ্ছে আমার শ্রদ্ধেয় বিরোধী আলোচকেরা যে সকল অসম্পূর্ণতা বা অসঙ্গতির কথা বলেন সেগুলো কতটা যৌক্তিক বা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে আমার সঙ্গত কারণেই যথেষ্ট সন্দেহ আছে।  

কারণ কোনো পারিভাষিক শব্দ বা প্রতিশব্দের অসঙ্গতি  বা অসম্পূর্ণতা আলোচনা করতে হলে একটি স্বার্থক পারিভাষিক শব্দের বৈশিষ্ট্যের আলোকে করতে হবে। কিন্তু বিরোধী আলোচকেরা সেটির ধারে কাছেও যান না।

এখন দেখা যাক একটি স্বার্থক পারিভাষিক শব্দের বৈশিষ্ট্যেগুলো কী এবং এর আলোকে আন্তর্জাল শব্দটির অসঙ্গতি  বা অসম্পূর্ণতা কতটুকু।

নূরুল হুদা তাঁরা বাংলা পরিভাষা প্রণয়ন নীতি প্রসঙ্গে শীর্ষক প্রবন্ধে স্বার্থক পারিভাষিক শব্দের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

  • শব্দটি যে বিদেশী শব্দকে প্রতিস্থাপন করবে তার অর্থকে সম্পূর্ণভাবে না হলে একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ধারণ করবে। যেমন blood pressure এর বাংলা হয়েছে “রক্তচাপ”।
  • যতটা সম্ভব সহজবোধ্য এবং শ্রুতিমধুর হতে হবে। যেমন Home Page-এর বাংলা “নীড় পাতা”
  • অর্থের দ্ব্যর্থহীনতা থাকতে হবে।
  • শব্দটির সঙ্গে অন্য শব্দ এবং প্রত্যয়াদি যোগ করে একই ধারণার সাথে সম্পর্কিত পারিভাষিক শব্দ পরিবার তৈরি করার ক্ষমতা থাকতে হবে। উদাহরণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর institution এর বাংলা প্রতিশব্দ করলেন “প্রতিষ্ঠান”। এর সাথে –ইক্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বিশেষণ ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ গঠিত হতে পারে। এ যে প্রত্যয় –ইক্কে নিজের সাথে আত্মীকরণ করে নতুন পারিভাষিক শব্দ পরিবার তৈরি করার ক্ষমতা এটি পরিভাষা জন্য বিরাট একটি ইতিবাচক দিক।

আমরা “আন্তর্জাল” শব্দকে বিশ্লেষণ করলে শেষোক্ত গুণটি ছাড়া প্রায় সবগুলো গুণই দেখতে পাই। আন্তর্জাল এর বিশেষণ কী হবে: আন্তর্জালিক নাকি আন্তর্জালীয়? সে প্রশ্নে এসে আমাদের স্বল্পজ্ঞান-মানুষদের থমকে দাঁড়াতে হয়। তাই সে প্রশ্নের উত্তর ভাষাবিদদের ঘাড়ে রেখে দিয়ে আমাদের আলোচনার বাকি প্রসঙ্গে যাওয়াটা ভালো হবে। (তবে বর্তমানে অনেক বাংলা ভাষাভাষী দেখছি ‘আন্তর্জালিক’ শব্দটিই ব্যবহার করছেন।) তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আন্তর্জালে এ গুণটি নেই। তবে শুধু এ গুণের অভাবে “আন্তর্জাল”-কে বাদ দিতে গেলে সেটা বড্ডো বেশি অবিচার হয়ে যায়। সে অর্থে ইংরেজিতেই তো internet এর খাঁটি কোনো বিশেষণ চোখে পড়ে না।

তাছাড়া সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ পরিভাষা-প্রণয়নের জন্য জেদ ধরে বসে থাকলে কার্য্যনাশ মাত্র হইবে। কোন পরিভাষায় নির্দোষ এবং সম্পূর্ন হইবে এরূপ আশা করা যায় নাএটা স্বয়ং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিভেদীর কথা যাকে বলা হয় বাংলা ভাষায় পরিভাষার আদি-স্থপতি। যারা পরিভাষার অসঙ্গতির কারণে তা ব্যবহারে অনিচ্ছুক রবীন্দ্রনাথ তাঁদের জন্য তাঁর “পরিভাষা” শীর্ষক প্রবন্ধে স্বান্তনাবাণী উচ্চারণ করে গেছেন এভাবে “ভাষার একটি সুবিধা হলো বার বার ব্যবহারের দ্বারাই শব্দবিশেষের অর্থ আপনি পাকা হয়ে উঠে, মূলে যেটা অসংগত, অভ্যাসে সেটা সংগতি লাভ করে তাই হয়তো রামেন্দুসুন্দর ত্রিভেদী তাঁর “বৈজ্ঞানিক পরিভাষা” শীর্ষক প্রবন্ধে উপদেশ দিয়ে গেছেন, সুবিধা, সরলতা শ্রুতিসুখতা প্রভৃতির দিকে দৃষ্টি রাখিয়া, ব্যাকরণ বা বুৎপত্তির খুঁটিনাটি ত্যাগ করিয়া, একটু সাহসের সাথে চলিতে হইবে, মূল কথা এই আমাদেরকেও একটু সাহসের সাথে চলা শুরু করতে হবে।

 ৫

আলোচক বন্ধুরা Internetকে ইন্টারনেট হিসাবে ব্যবহার করার জন্য অনেক ভাষার উদাহরণ ঠেনে আনেন। কিন্তু একটি বাস্তব সত্য আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে। ল্যাটিন বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত শব্দগুলো যেরকম সহজে ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় স্থান করে নিতে পারে সে রকমভাবে আমাদের উপমহাদেশের ভাষাগুলোতে পারে না। কারণ ল্যাটিন ভাষা হচ্ছে এদের পূর্বপুরুষ, আর আমাদের হচ্ছে সংষ্কৃত। তাঁদের মূলগত মিল এবং পূর্ব আত্মীয়তার কারণে তারা ল্যাটিন বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত শব্দগুলোকে নিজেদের ভাষার শব্দ হিসাবে মেনে নিতে পারে। আমাদেরও মেনে নিতে আপত্তি নেই, কিন্তু যখন বিকল্প দেশী প্রতিশব্দ আছে সেটিকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তাছাড়া ইংরেজিতেও কিন্তু অন্যভাষার শব্দগুলো একেবারে হুবুহু বসে না। বেশিরভাগই কিছু পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং সেটাই ইংরেজি ভাষায় সৌন্দর্য। রবীন্দ্রনাথে মতে, ইংরেজি ভাষা ল্যাটিন নিয়মে আপনার বিশুদ্ধি রক্ষা করে না। যদি করত, তবে এ ভাষা এত প্রবল, এত বিচিত্র এত মহৎ হয়তো না তারা যদি পরিবর্তন করে শব্দ আপন মনমতো করে নিতে পারে আমরা কেনো পারব না?

আরেকটি ব্যাপার: পৃথিবীর হাজারটা ভাষার উদাহরণ আনলে তার দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষার গতি প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাঙালিই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছন। ভাষার প্রতি বাঙালির আবেগ অন্যদের চেয়ে এ যদি একটু বেশি-ই হয়, তারা যদি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা অহংবোধ বা বিশুদ্ধবাদীতার আশ্রয় নিতে চায় তবে মনে হয় না সেটা খুব বেশি নিন্দার্হ হবে এবং আমি মনে করি এতটুকু বিলাসিতা করার অধিকার আমাদের আছে।

অনেকেই প্রযুক্তিগত শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ প্রচলনের বিরোধিতা করেন। এ ব্যাপারে আমি উনা্দের সাথে বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষন করছি। আমিও বাংলা প্রতিশব্দ প্রচলনে খুব বেশি সমর্থক নয় তবে সেটা প্রযুক্তিগত শব্দে নয়, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Technical Terms সেগুলোর ব্যাপারে। যেমন আমি মার্কেটিং-এর ছাত্র হিসাবে SWOT analysis, demarketing শব্দগুলো সাথে পরিচিত কারণ এগুলো হচ্ছে marketing এবং management এর কিছু বিশুদ্ধ Technical Terms: বাংলা পরিভাষা না খুঁজলেও চলে। কারণ এগুলো শুধুমাত্র সংশ্লিষ্টদেরকে জানতে হয়,; বাকিদের না জানলে, না বুঝলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু যখন কোন Technical Terms কোন কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নিয়িমিত আনাগুনা শুরু করে তখন সেটির যথার্থ পরিভাষা চয়ন করতে চেতন বা অবচেতনভাবে মানুষের মন চেষ্টা করতে থাকে। অনেক সময় সে চেষ্টা সফলতা লাভ করে আবার অনেক সময় করে না। যেমন High Blood pressure বা Low Blood pressure এর খাঁটি বাংলা পরিশব্দ দাঁড়িয়ে গেছে উচ্চরক্তচাপ এবং নিম্নরক্তচাপ। এগুলোকে আমরা যেমন আপন করে নিয়েছি সেভাবে “আন্তর্জাল”কে আপন করে নিতে দোষ কী? সব প্রযুক্তিগত শব্দের বাংলা মানে নাই বা খুঁজলাম, তাই বলে যে শব্দগুলোর যথার্থ পরিভাষা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে সেগুলোকে বরণ করে নিতে কুণ্ঠা থাকা কতটুকু যৌক্তিক? সব বিদেশী শব্দের দেশী প্রতিশব্দ খুঁজা বিকৃত মানসিকতা লক্ষণ হয়তো, কিন্তু সে অজুহাতে “আন্তর্জাল”এর মতো সুন্দর একটি পারিভাষিক শব্দকে দূরে সরিয়ে রাখলে আমাদের বাংলা ভাষায় বঞ্ছিত হবে।

আবার সেই রবীন্দ্রনাথের সে কথাটিতে ফিরে যাই: চিরকালই দখলের দলিলটাই ভাষায় স্বত্ত্বের দলিল হয়ে উঠে তাই শব্দের ক্ষেত্রে যাতে করে দেশি শব্দগুলোই দখলের দলিলটা পেতে পারে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বিদেশি শব্দের প্রতি আমাদের কোনো শুচিবায়ু নেই; কিন্তু এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে যখন যথাযোগ্য দেশি শব্দ দুয়ারে এসে কড়া নাড়ে তখন তাঁকে বরণ নিতে হবে; এতে বিদেশী শব্দের মানহানী যদি কিছু হয় তা সত্ত্বেও। বাহান্নর চেতনা নূন্যতম এতটুকু স্বাতন্ত্রবোধ আমাদের কাছে দাবি করে। অনেকেই আবার বলবেন তাহলে কি আমরা ই-মেইলকে বৈদ্যুতিক চিঠি, কম্পিউটারকে গণনাযন্ত্র বলব। আমার উত্তর হলো ‘না’। এগুলোর শ্রতিমধুর, যথার্থ পারিভাষিক শব্দ হয়তো আমরা উদ্ভাবণ করতে পারি নি। কিন্তু একটি অক্ষমতার উদাহরণ দিয়ে আরেকটি সফলতাকে আড়াল বা অস্বীকার করার কোন মানে হয় না। তাই আমাদের উচিত ‘আন্তর্জাল, নীড়পাতা, বেতার সারথী’র মতো সুন্দর পারিভাষিক শব্দগুলোকে গ্রহণ করা এবং ব্যবহার করা। প্রথম প্রথম হয়তো অনভ্যস্ত কানে একটু খটকা লাগে কিন্তু সেটা অভ্যাসে ঠিক হয়ে যায়।

 আসল কথা হলো শব্দ একটি সঙ্কেত মাত্র। পাঁচজন মিলিয়া মিশিয়া সঙ্কেতটা সর্ব্বত্র সর্ব্বদা এক অর্থে প্রয়োগ করিলেই জীবনযাত্রা চলিয়া যায় ও ভাষার উদ্দেশ্যও সাধিত হয়

এ যে আমাদের সবাই মিলে একটি শব্দকে প্রতিষ্টিত করার ক্ষমতা সেটার সুবিধা প্রথমে বাংলা শব্দগুলোরই পাওয়া উচিত। তাই আমি ‘ইন্টারনেট’ নয়, ‘আন্তর্জাল’-এর পক্ষে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s